Home / অর্থ-বাণিজ্য / ঈদে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন

ঈদে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন

নিজস্ব প্রতিবেদক :

একদিন পরই কোরবানি ঈদ। ঈদ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত দেশের মানুষ। কোরবানির পশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন কেনাকাটায় সাধ্য অনুযায়ী ব্যয় করছেন সবাই। লেনদেন হচ্ছে অর্থের। বাড়তি কেনাকাটায় বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। চলমান অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বোনাস, প্রবাসী আয় ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবাহ। এর প্রভাব পড়েছে গোটা অর্থনীতি, অর্থাৎ দেশজ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায়। ফলে বেড়ে গেছে উৎসব অর্থনীতির আকার। বিশেষ করে মানুষের আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ও কোরবানির পশু কেনাকাটায় বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হওয়ায় গেল রোজার ঈদের চেয়ে এই ঈদে অর্থনীতির আকার বেড়েছে অন্তত ৩০ শতাংশ বেশি। সব মিলে চাঙ্গা দেশের অর্থনীতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ঈদের কারণে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। শহর থেকে গ্রামমুখী হয়েছে টাকার প্রবাহ। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এ সময় পশুসহ অন্য সব খাতেই লেনদেন অনেক বাড়ে। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবিরতা ছিল, সেটা কেটে যায়। বিশেষ করে বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি কম থাকায় ঈদে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে।

অন্যদিকে ঈদ মৌসুমে গ্রামগুলোতে অর্থ প্রবাহ অনেক বেড়ে যাওয়ায় গ্রামেগঞ্জে নিত্যপণ্যের দামও বৃদ্ধি পায়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে নিয়মিত বসবাস করছেন- এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। এদের মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ মানুষই রাজধানী ছেড়ে গ্রামে ঈদ উদযাপন করতে ছুটে যান। এতে গ্রামে অর্থ সরবরাহ অনেক বেড়ে যায়।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দুই ঈদেই বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। শহর থেকে গ্রামমুখী হয় টাকা। অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক দিক হলো, বণ্টন ব্যবস্থায় একটি পরিবর্তন হয়। এতে অধিকাংশ মানুষের কাছেই টাকা পৌঁছে যায়। আর নেতিবাচক দিক হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।

এফবিসিসিআই ও দোকান মালিক সমিতি এবং ঈদ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ঈদ অর্থনীতির এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতি বছরের মতো এবারো ঈদ অর্থনীতির একটি হিসাব কষেছে ‘দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (এফবিসিসিআই)। সংগঠনের হিসাবমতে, বাংলাদেশে বার্ষিক অর্থনীতির আকার প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ কোটি টাকা। আর সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর ঈদ অর্থনীতির আকার শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো দাঁড়াবে। গত রোজার ঈদে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।

‘এরমধ্যে শুধু কোরবানির পশু কেনাবেচায় লেনদেন হবে ৬৫-৭০ হাজার কোটি টাকা’- যোগ করেন এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান পরিচালক ও সাবেক সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, কোরবানি ঈদে আমরা ব্যবসার কথা চিন্তা করি না। কোরবানির পশু কেনাবেচাটাই মুখ্য। সব মিলে ৫-১০ শতাংশ ব্যবসা হয়।

এফবিসিসিআই লেনদেনের ১০টি খাত থেকে কোরবানির ঈদ অর্থনীতির হিসাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোরবানির পশু ও চামড়া কেনাবেচা, মসলা, পশু জবাই উপকরণ, রেমিট্যান্স, পরিবহন, ভ্রমণ-বিনোদন, সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং পোশাক খাত ও দোকান কর্মচারীদের বোনাস এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নোট।

দেশের প্রতিটি পশুর হাটের তালিকা করে সেগুলোতে কত কেনাবেচা হয়েছে তার একটি অনানুষ্ঠানিক হিসাব করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস। সে হিসাবমতে, গত কোরবানির ঈদে ৪০ লাখ ৬১ হাজার গরু ১৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকায় কেনাবেচা হয়। এবার গরু কোরবানি ৫-৭ শতাংশ বেড়ে বিক্রি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪২ লাখে। যার আর্থিক মূল্য দাঁড়াবে কম-বেশি ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে ছাগল এবং অন্যান্য পশু বিক্রি হয় ২ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঈদে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার পশু কেনাবেচা হতে পারে।

কোরবানির পর ১ কোটি ৭০ লাখ পশুর চামড়া আসার কথা। প্রতি পিস চামড়ার দাম গড়ে এক হাজার টাকা ধরা হলে চামড়া ক্রয়-বিক্রয় বাবদ লেনদেন হবে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চামড়া সংগ্রহ করা হয় ৮৫ লাখ পিস। এর দাম পড়ে ৮৫০ কোটি টাকা। আরো প্রায় ৮৫ লাখ পিস চামড়া নষ্ট হচ্ছে বা পাচার হচ্ছে। যার মূল্য প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা।

এদিকে চামড়া কেনার জন্য ব্যাংকগুলো এবার কমপক্ষে ৭০০ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। রফতানির অর্থও দেশে আসছে। এ ছাড়া ঈদে গ্রাহকদের নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঈদ অর্থনীতিতে আরো ২৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ছেড়েছে।

রাজধানীর মৌলবীবাজার মসলা ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যমতে, প্রতি বছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। রসুনের চাহিদা ৫ লাখ টন, আদা ৩ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে গরম মসলা বিশেষ করে এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতার উল্লেখযোগ্য অংশ কোরবানিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ টন এলাচ, ৭ হাজার ৬০০ টন দারচিনি, ১৭০ টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ টন জিরা আমদানি করা হয়েছে। সব মিলে এবার কোরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের।

কোরবানির পশু জবাই ও মাংস তৈরিতে অবশ্য প্রয়োজনীয় উপকরণ হলো ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, রামদা ইত্যাদি। এগুলোর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানির সময় এসব উপকরণের বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

ঈদ সামনে রেখে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে গত আগস্টের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১১৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, বাংলাদেশের মুদ্রার হিসাবে প্রায় ৯ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা। এর বাইরে হুন্ডি ও নগদ আকারে এসেছে ৬০ শতাংশ। এসব মিলে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। যার বেশির ভাগই ঈদ অর্থনীতিতে খরচ হবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। এ উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এর বাইরে আরো কয়েকটি খাতের কর্মকাণ্ড অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস বাবদ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা, দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বোনাস ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ঈদ অর্থনীতিতে বাড়তি আসছে।

 আরডি/ ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

x

Check Also

আরো আট নারী ও শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ

সাভারের আশুলিয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দুই ...