Home / অর্থ-বাণিজ্য / বেড়েছে প্রাইভেট কার ও জিপের ক্রেতা

বেড়েছে প্রাইভেট কার ও জিপের ক্রেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

টাকা হলেই স্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার প্রবণতা মানুষের সহজাত। এক্ষেত্রে সচ্ছল জনগোষ্ঠীর পছন্দের তালিকার শুরুতেই থাকে বাড়ি ও গাড়ি। দেশের মধ্যবিত্তদের মধ্যেও এমন প্রণতা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ক্রমেই বাড়ছে প্রাইভেট কার ও জিপের ক্রেতা। এক বছরের ব্যবধানে প্রাইভেট কার ও জিপের নিবন্ধন বেড়েছে ৪৮ শতাংশ।

গণপরিবহন ব্যবস্থায় সংকট, নিরাপত্তা ঘাটতি ও ব্যাংকঋণ সুবিধার কারণে দেশের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ব্যক্তিগত গাড়ি। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশে নিবন্ধিত জিপ বা স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি) ও প্রাইভেট প্যাসেঞ্জার কারের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৯টি। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৬৬৩টিতে। এ হিসাবে এক বছরে নিবন্ধিত প্রাইভেট কার ও জিপের সংখ্যা বেড়েছে ৪৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

চলতি বছরেও নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যার প্রবৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। বছরের প্রথম আট মাসে ১৭ হাজার ৯৩৪টি এসইউভি ও প্রাইভেট কার নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ এ বছর প্রতি মাসে গাড়ি কেনা হয় ২ হাজার ২৪১টি। এ হিসাবে চলতি বছরে গাড়ি ক্রয়ের সংখ্যা ২৬ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

গাড়ি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রেতা। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্যও কেনা হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ি। নিজস্ব উত্পাদন না থাকায় আমদানিনির্ভর রিকন্ডিশন্ড গাড়ি দিয়ে মেটানো হচ্ছে এ চাহিদা। জাপান, কোরিয়া ও ভারত থেকে আমদানিকৃত গাড়ির ক্রেতাই তুলনামূলক বেশি।

শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে মোটরচালিত যানবাহনের চাহিদা। আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিলাসবহুল বাস, আবার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সেডান কার সবক্ষেত্রেই চাহিদার উল্লম্ফনের চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। শহরে ট্যাক্সি সেবা, মেট্রোরেল, ট্রেনের মতো গণপরিবহনের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি উসকে দিচ্ছে মানুষের চাহিদাকে। পাশাপাশি নিজস্ব যানবাহনে নিরাপত্তা নিশ্চিতের উপলব্ধি থেকে স্বাভাবিকভাবেই গাড়ি ক্রয়প্রবণতা বাড়ছে।

বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকল ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হামিদ শরিফ জানান, ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ গণপরিবহনের ঘাটতি। তিনি বলেন, ‘বারভিডার সর্বশেষ গাড়ি প্রদর্শনীতে এক নবদম্পতি আসেন। তারা দুজনই কর্মজীবী। পরিচয় পেয়ে আমার কাছ থেকে তারা ফ্ল্যাট কিংবা গাড়ির মধ্যে কোনটি কিনবেন, সে বিষয়ে পরামর্শ চান। আমি তাদের ফ্ল্যাট কেনার পরামর্শ দিই। কিন্তু তৃতীয় দিন এসে তারা গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত জানান এবং গাড়ি কেনেন। এক্ষেত্রে তারা কারণ হিসেবে তাদের ভূমিষ্ঠ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা শিশুর পরিবহন নিরাপত্তার কথা জানান। বলতে চাচ্ছি, মূলত পরিবহন নিরাপত্তার কারণেই ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রেতা বেড়েছে। খুব সম্পদশালী না হলেও যাতায়াত বিড়ম্বনা ও নিরাপত্তার স্বার্থেই গাড়ির প্রতি ঝুঁকছে মানুষ।’

বারভিডা সভাপতি বলেন, গাড়ির ক্রেতা বেড়েছে, আর তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নিবন্ধন পরিসংখ্যানে। এক বছরের ব্যবধানে গাড়ি বিক্রির হার অনেক বাড়ার কারণ মূলত দুটি। এসইউভির ক্ষেত্রে কারণ হলো— সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি। আর প্রাইভেট প্যাসেঞ্জার কার বৃদ্ধির কারণ আয় বৃদ্ধির কারণে শহুরে উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রয়সক্ষমতা বৃদ্ধি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, আজকাল অনেক প্রাইভেট কারের বিশেষত্বের কারণে তা এসইউভি হিসেবেই নিবন্ধন হচ্ছে। যেমন টয়োটার রাশ ও নিশানের জুকি।

জানা গেছে, দেশে জিপ ও প্রাইভেট কারের বাজারের ৮০ শতাংশ জাপানের টয়োটা কোম্পানির দখলে। এর ৮৫ শতাংশ হলো সেডান কার। দেশে সেডান কারের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো হলো— টয়োটা, নিশান, মিত্সুবিশি, প্রোটন, টাটা ন্যানো, চেরি, কিয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় টয়োটার মডেলগুলোর মধ্যে প্রিমিও, এলিয়ন, এক্সিও অন্যতম। এছাড়া জিপের মধ্যে টয়োটা প্রাডো, মিত্সুবিশি পাজেরো, নিশান প্যাট্রল, মাহিন্দ্রা ইত্যাদি মডেল জনপ্রিয়। এছাড়া শহরগুলোয় স্বল্প সংখ্যক হলেও প্রগতির গাড়ি দেখা যায়। প্রগতি ছাড়াও দেশের গাড়ি সংযোজন ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আফতাব অটোমোবাইলস, হকস বে অটোমোবাইলস, এইচএস এন্টারপ্রাইজ, এক্সিকিউটিভ মোটরস, প্যাসিফিক মোটরস উল্লেখযোগ্য। নতুন ও রিকন্ডিশন্ড প্রাইভেট কারের দাম ব্র্যান্ড ও মডেলভেদে ৮ লাখ থেকে ২৮ লাখ টাকা। আর এসইউভির দাম ৪০ লাখ থেকে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।

বর্তমানে গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষমতাভেদে সর্বনিম্ন ১২৯ থেকে সর্বোচ্চ ৮৩৯ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিয়ে গাড়ি কিনতে হয়। বিপুল পরিমাণ শুল্ক দিয়ে রিকন্ডিশন্ড গাড়িই বেশি আসছে। মোট নিবন্ধিত গাড়ির ৮৫ শতাংশই রিকন্ডিশন্ড। বাকি ১৫ শতাংশ নতুন গাড়ি। এর মধ্যে ১ থেকে ২ শতাংশ বিলাসবহুল গাড়ি। বারভিডার হিসাবে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড ইম্পোর্টেড ভেহিকল সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৪২৭টি। ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৫৫টিতে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের প্রধান শহরগুলোয় গাড়ির ক্রেতা বাড়ার আরো একটি কারণ হলো ব্যাংকঋণ সুবিধা। উঠতি মধ্যবিত্তরা যাতায়াত ও পরিবহন নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে এ সুবিধাটিও ভালোভাবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। তবে এক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের সুদ ও ঋণের অনুপাত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে বলেও জানান তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বারভিডার উপদেষ্টা ও হকস বে অটোমোবাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হক বলেন, উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণী গণপরিবহনের ঘাটতি ও নিরাপত্তাবোধের কারণে গাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকঋণকে তারা একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে ব্যাংকঋণের সুবিধা ব্যবহারের মাধ্যমে গাড়ি কেনার ব্যাপকতা তেমন বাড়ছে না। কারণ আগে ক্রেতার কাছে গাড়ির মোট দামের ২০ শতাংশ থাকলে বাকি ৮০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দিত ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক মোট দামের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ দেয়া যাবে না বলে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। আবার পাঁচ বছরের পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোও ঋণ দিচ্ছে না। এসব বিধি-নিষেধের কারণে গাড়ি কেনার প্রবণতার ব্যাপকতা দেখা যাচ্ছে না। আর এর পাশাপাশি উচ্চশুল্ক সমস্যাও ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রয়প্রবণতাকে থমকে দিচ্ছে।

 আরডি/ ১ অক্টোবর/ ২০১৬

x

Check Also

আরো আট নারী ও শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ

সাভারের আশুলিয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দুই ...