Home / টপ নিউজ / মমতা তিস্তা চুক্তির পরিবর্তে এক বিকল্প প্রস্তাব

মমতা তিস্তা চুক্তির পরিবর্তে এক বিকল্প প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

তিস্তার পরিবর্তে অন্য যেসব নদী থেকে পানি নিতে বললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই নদীগুলো অপ্রশস্ত ও মৃতপ্রায়। এমনকি সেখানকার কয়েকটি নদীর এখন আর অস্তিত্বই নেই। ফলে ওইসব নদী থেকে আদৌ পানি আনা যাবে কি না, আর আনলেও কতটুকু আনা যাবে এবং সে পানিতে বাংলাদেশের মানুষের সুবিধা হবে কিনা—তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে তিস্তায় পানি নেই বলে দেওয়া মমতার বক্তব্যেরও কোনো সত্যতা মেলেনি।

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের তিস্তার পানি সমীক্ষা বলছে, ১৯৮২ সালে ভারত উজানে গজলডোবার কাছে তিস্তা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে ও ডাইভারশন খাল কেটে মহানন্দা নদীতে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে উজানে তিস্তার ওপর আরেকটি এবং এ রকম ছোট ছোট একাধিক বাঁধ নির্মাণ করে পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে তিস্তায় পানির কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। গতকাল সরকারের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটে খোঁজ নিয়ে এবং দেশের পানি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে তিস্তার ব্যাপারে সর্বশেষ এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গত শনিবার নয়াদিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তির পরিবর্তে এক বিকল্প প্রস্তাব দেন। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তিস্তা চুক্তি ঝুলিয়ে রাখার পর সেদিন সন্ধ্যায় পানি সমস্যা মেটাতে ভারতের উত্তরবঙ্গের তোরষা, জলঢাকাসহ কয়েকটি নদীর পানিবণ্টনের বিকল্প প্রস্তাব দেন মমতা। সেখানে তিনি বলেন, তিস্তায় কোনো পানি নেই। পানির অভাবে এনটিপিসির বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। সেচের জন্য পানি পেতে সমস্যা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গে তোরষা, জলঢাকাসহ চারটি নদী আছে। সেখানে পানি আছে। তিস্তার বিকল্প হিসেবে এ চারটি নদীর পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।

মমতার এই বিকল্প প্রস্তাবের ফলে আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল তিস্তা চুক্তি। অথচ এর আগে শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের একপর্যায়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডেকে নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও বৈঠকে যোগ দেন। সেখানেও মোদি তিস্তার বিষয়টি তোলেন। সেদিন দুপুরে হায়দরাবাদ ভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মমতাকে সামনে রেখে দ্রুত তিস্তা চুক্তির করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেন। এ আশ্বাসের পর কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই তিস্তা নিয়ে উল্টো বিকল্প প্রস্তাব দেন মমতা। মমতার একরোখা মনোভাবের কারণেই ছয় বছর আগে সব প্রস্তুতির পরও তিস্তা চুক্তি থেকে সরে আসে ভারত।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প প্রস্তাবটা এরকম বাংলাদেশ তিস্তার পরিবর্তে উত্তরবঙ্গের তোরষা, জলঢাকা, ধানসিঁড়ি, রায়ডাক, ধরলা ও মানসিঁড়ি নদী থেকে পানি নিতে পারে। কারণ এসব নদীই ভারত থেকে বিভিন্ন জেলা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মমতা এমনও বলেছেন, তোরষায় সারা বছর পানি থাকে। পানি নেওয়া যেতে পারে ধানসিঁড়ি নদী থেকেও। কিন্তু মানচিত্র থেকে ও নদী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তোরষার উৎপত্তি চীনের তিব্বতের চুম্বি ভ্যালিতে। সেখানে সেটি মাচু নদী নামে পরিচিত। এরপর ভুটান হয়ে ৩৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার হয়ে ঢুকেছে বাংলাদেশের উত্তরে। বাংলাদেশে নদীটি জলঢাকার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। জলঢাকা মিশেছে যমুনা নদীতে। তোরষা তিস্তার প্রবাহ পথ থেকে বেশ কিছুটা উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। আর ধানসিঁড়ি আসামের মূল নদী। এর উৎপত্তি নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে। ৩৫২ কিলোমিটার প্রবাহ পথে আসাম হয়ে সেটি ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে। রায়ডাক হচ্ছে জলঢাকার উপনদী। অত্যন্ত সংকীর্ণ এ নদীটি এসে জলঢাকায় মিশেছে। বিশেষজ্ঞরা এমনও জানিয়েছেন, এসব নদীর কোনোটিই তিস্তার মতো প্রশস্ত নয় এবং মৃতপ্রায়। সেখানে পানিও কম।

মমতার এ বিকল্প প্রস্তাব ও তিস্তা চুক্তি নিয়ে গতকাল প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নদী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা হয়। এসব বিশেষজ্ঞ মমতার বক্তব্যকে ‘অমূলক’ এবং ‘তিস্তা চুক্তি থেকে সরে আসার কৌশল’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ উজানে বাঁধ দিয়ে তিস্তার পানি সরিয়ে নিচ্ছে। অথচ তিস্তা খসড়া পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী ভারত তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি দিতে বাধ্য। তিস্তাতে যেটুকু পানি আছে, সেটুকুই ভাগ হবে। তিস্তার বিকল্প কিছু হতে পারে না। একই সঙ্গে বিকল্প প্রস্তাবের মাধ্যমে ভারত তিস্তা চুক্তি না করার কৌশল নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ কথাও বলেন, ভারত তিস্তা নিয়ে খেলছে। কেন্দ্রীয় সরকার মমতার দোষ দিলেও ভারত তিস্তা চুক্তিতে যেতে চায় না। তারা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন চুক্তি করতে পরামর্শ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ও নদী বিশেষজ্ঞ ড. প্রকৌশলী লুতফর রহমান বলেন, মূল তিস্তায় পানির অভাব নেই। কিন্তু বাংলাদেশের ওপরে অর্থাৎ উজানে তিস্তার ওপর বাঁধ দিয়ে ভারত পানি সরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরে একটি বড় বাঁধসহ তিস্তার ওপর ছোট ছোট একাধিক বাঁধ দিয়েছে ভারত। সে বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ে যায়। বাংলাদেশের তিস্তায় পানি আসে না। এমনকি মূল তিস্তায় পানি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে।

মমতার বিকল্প প্রস্তাব প্রসঙ্গে এই নদী বিশেষজ্ঞ বলেন, জলঢাকা ও তোরষাসহ যেসব নদীর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো মৃতপ্রায়। ওই নদীগুলোতে পানি নেই। সেখান থেকে পানি আনা সম্ভব না। এই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে বলেন, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলে তিস্তা চুক্তি হবে না। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিকভাবেও চাপ দেওয়া যেতে পারে। ভারত নিজেদের স্বার্থে স্রোতস্বিনী নদীটিকে গলা টিপে মেরে ফেলছে।

বর্তমানে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে পানির প্রবাহ কেমন—জানতে চাইলে এই প্রকৌশলী লুতফর রহমান বলেন, বর্ষায় গড়ে ১২ হাজার কিউসেক থাকে। কারণ তখন ভারত গেট খুলে দেয়। পানি আসে। কিন্তু শুকনো মৌসুমে মাত্র ৩ হাজার কিউসেক পানি থাকে। ঝরণার মতো অল্প পানি পড়ে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক জি এম তারেকুল ইসলাম বলেন, তিস্তা (ভারতের অংশে) পুরোটাই পানিতে ভরা। বছরজুড়ে সেখানে সবসময় পানি থাকে। কিন্তু ভারত গজলডোবা বাঁধ দিয়ে সে পানি নিয়ে যায়। তাদের কৃষিতে ব্যবহার করে। সুতরাং এই বাঁধ দিয়ে ভারত যে পানি নিচ্ছে, সেটা বন্ধ করতে হবে। এটা চুক্তি পরিপন্থী। এটা কোন কথা হতে পারে না। চুক্তি করলে ভারত ইচ্ছেমতো পানি নিতে পারবে না। চুক্তি অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে। তাই তারা চুক্তি করতে চায় না।

মমতার বিকল্প প্রস্তাব প্রসঙ্গে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, যে নদীগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো বাংলাদেশের কাছাকাছি নদী। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চুক্তি না হলে সে নদীগুলো থেকেও তো পানি আনা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি তিস্তার ব্যাপারে সমীক্ষা করার ওপরও জোর দেন।

জল পরিবেশ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ও নদী বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইনামুল হক বলেন, তিস্তায় পানি আছে। বাঁধ দিয়ে সিকিম আটকে রেখেছে। একটাছোট রাষ্ট্রের জন্য এত পানি নিয়ে যাচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ এত বড় একটি রাষ্ট্র পানি পাচ্ছে না। এটা হতে পারে না। তিস্তা চুক্তির পরিবর্তে মমতার বিকল্প প্রস্তাব- আসলে ভারতের কেন্দ্রিয় সরকারের রাজনীতি।

মমতার বিকল্প প্রস্তাবকে এই বিশেষজ্ঞ ভারতের রাজনীতি উল্লেখ করে বলেন, যেসব নদীর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো ছোট মৃতপ্রায় নদী। অল্প পানি সেখানে। তাছাড়া সেগুলোর অববাহিকাও ভিন্ন। সুতরাং সেখান থেকে কিভাবে পানি আনবে? আসলে ভারত তিস্তা নিয়ে রাজনীতি করতেই এমন প্রস্তাব দিয়েছে।

অপর নদী বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক শরিফ জামিল বলেন, তিস্তায় পানি আছে। পাহাড় থেকে পানি আসে। সুতরাং পানি নেই বলে মমতা যে তথ্য দিয়েছেন, তা অপ্রাসঙ্গিক। ভারত বাংলাদেশ থেকে উপরে অর্থাৎ উজানে তিস্তা নদীর ওপর গজলডোবা বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। সুতরাং তিস্তা চুক্তিতে বাধা নেই। ঐতিহাসিক চুক্তি অনুযায়ি তিস্তার নায্য হিস্যা দিতে হবে।

মমতার বিকল্প প্রস্তাব অপ্রাসঙ্গিক—মন্তব্য করে এই নদী বিশেষজ্ঞ বলেন, জলঢাকা, তোর্সা ও ধরলাসহ যেসব নদীর কথা বলা হচ্ছে, এগুলো অপ্রাসঙ্গিক। সবগুলোই অভিন্ন নদী। তা হলে কি সব নদীর জন্য পৃথক পৃথক চুক্তি করতে হবে? তাছাড়া যেসব নদীর কথা মমতা বলেছেন, সেগুলো ছোট নদী। তিস্তার সঙ্গে তুলনা হয় না। তিস্তাসহ এসব নদীর ব্রক্ষপুত্র অববাহিকার নদী। ভারতের একার সম্পদ নয়। এই নদীর পানি আসবেই। সেখানে ভারতের বাধা দেওয়া উচিত নয়। তিস্তার আলোচনা অন্য দিকে নিতেই মমতা এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রস্তাব দিয়েছেন। আসলে ভারত তিস্তা চুক্তি করতে চায় না।

সাব্বির//এসএমএইচ // এপ্রিল১০২০১৭

x

Check Also

আরো আট নারী ও শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ

সাভারের আশুলিয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দুই ...